
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি হলো রোজা। ইমান, নামাজ, জাকাত ও হজের পাশাপাশি রমজানের রোজা মুসলিম জীবনে আত্মসংযম, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির অনন্য অনুশীলন।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনায় আসে—
পৃথিবীতে প্রথম রোজা কে রেখেছিলেন?
রোজা কি শুধু উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য নির্ধারিত, নাকি আগের নবি-রাসুলদের যুগেও ছিল? এ বিষয়ে কুরআন, হাদিস ও আলেমদের বক্তব্য কী বলে? চলুন বিস্তারিত জানি।
📖 কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগের লোকদের ওপর—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”
(সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়—
রোজা শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের জন্য নয়; বরং পূর্ববর্তী নবি-রাসুল ও তাদের উম্মতের ওপরও রোজা ফরজ ছিল।
🕊️ প্রথম রোজাদার কে ছিলেন?
যেহেতু হজরত আদম (আ.) ছিলেন প্রথম মানুষ ও প্রথম নবি, তাই অনেক আলেমের ধারণা—
সম্ভবত তিনিই পৃথিবীর প্রথম রোজাদার।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
👉 কুরআন বা সহিহ হাদিসে সরাসরি উল্লেখ নেই যে, “প্রথম রোজা আদম (আ.) রেখেছিলেন।”
অর্থাৎ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
🌿 সুফি বর্ণনায় আদম (আ.) ও রোজা
কিছু সুফি আলেমের বর্ণনায়—বিশেষত আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর বক্তব্যে পাওয়া যায়—
আদম (আ.) নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর তাওবা করতে থাকেন। দীর্ঘ সময় তার তাওবা কবুল হয়নি। পরে আল্লাহর নির্দেশে তিনি নির্দিষ্ট কিছু দিন রোজা রাখেন। এরপর তার তাওবা কবুল হয়।
আরেক বর্ণনায় বলা হয়—
তার সন্তানদের ওপর ৩০টি রোজা ফরজ করা হয়।
তবে হাদিস বিশারদ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ফতহুল বারি-তে উল্লেখ করেন—
এই বর্ণনাগুলোর সহিহ সনদ নেই এবং তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা কঠিন।
অর্থাৎ এগুলো ঐতিহাসিক বা আধ্যাত্মিক বর্ণনা হতে পারে, তবে চূড়ান্ত দলিল নয়।
🌕 আইয়্যামে বিজ ও আদম (আ.)-এর ঘটনা
আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়—
আদম (আ.) নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর তার দেহের রং পরিবর্তিত হয়। ফেরেশতারা দোয়া করলে আল্লাহ তাকে নির্দেশ দেন চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতে। তিনি রোজা রাখলে তার দেহের উজ্জ্বলতা ফিরে আসে।
এই তিন দিনকে বলা হয় আইয়্যামে বিজ (উজ্জ্বল দিন)।
তবে এ ঘটনাটিও সহিহ দলিল দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত নয়।
📜 সহিহ হাদিসে আইয়্যামে বিজ
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত—
রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর বা অবস্থান— কোনো অবস্থাতেই আইয়্যামে বিজের রোজা পরিত্যাগ করতেন না।
(সুনান নাসাঈ ২৪২০, মিশকাতুল মাসাবিহ)
এ থেকে বোঝা যায়—
আইয়্যামে বিজের রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নত আমল।
তবে এটিই পৃথিবীর প্রথম রোজা ছিল—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
🕌 পূর্ববর্তী নবীদের যুগে রোজা
কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের উম্মতদের মধ্যেও রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজার ধরন ও সময়কাল আমাদের রমজানের রোজার মতো ছিল কিনা—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই।
কিছু তাফসিরে উল্লেখ আছে—
কেউ কেউ সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখতেন
কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময় কথা বলা থেকেও বিরত থাকতেন
হজরত মারইয়াম (আ.)-এর ঘটনায় “নীরব থাকার মানত”-এর উল্লেখ আছে (সুরা মারইয়াম ২৬)
অর্থাৎ রোজার ধরণ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আত্মসংযম ছিল মূল উদ্দেশ্য।
🌙 রমজানের রোজা কবে ফরজ হয়?
উম্মতে মুহাম্মাদির ওপর রমজানের রোজা ফরজ হয় হিজরি ২য় সালে।
এটি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা বহাল থাকবে।
রমজানের রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়—
এটি হলো:
তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ
আত্মশুদ্ধি
ধৈর্য ও সংযমের শিক্ষা
দরিদ্রের কষ্ট অনুভবের মাধ্যম
📌 উপসংহার: প্রথম রোজাদার বিষয়ে চূড়ান্ত বক্তব্য কী?
সব আলোচনা মিলিয়ে বলা যায়—
✅ রোজা পূর্ববর্তী নবীদের যুগেও ছিল — কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে।
❌ তবে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কে রোজা রেখেছিলেন—এ বিষয়ে সহিহ ও চূড়ান্ত দলিল নেই।
🔎 অনেক আলেমের ধারণা আদম (আ.) প্রথম রোজাদার হতে পারেন, কিন্তু তা নিশ্চিত নয়।
অতএব, বিষয়টি নিশ্চিত দাবি না করে বলা উত্তম—
রোজা মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই ইবাদতের অংশ ছিল।